উদ্ভট গল্প ০৭
পর্ব-০৭
ডিউক আজ কর্মস্থলে
যায়নি। শরীরটা ভাল না। ইদানিং তার শরীর খুব খারাপ যাচ্ছে। মনটাও তেমন ভাল নেই। বারান্দায় মোড় পেতে বসে পাখির ছানা দুটো নিয়ে মজা
করছে; খেলেছে। হেনেরা ছানা দুটো রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছে। একটা ফিকে হলদের মধ্যে অগ্নিছটা
আর একটা সাদা রংয়ের। দেখতে খুব চমৎকার। কেমন কোমল- নরম আর নিষ্পাপ।
যেখানেই পেয়ে থাকুক সেটা বড় কথা নয়, হাজার হলেও জীব তো। তাই ওদের প্রতি ডিউকের
কেমন একটা মায়া পরে গেছে। ডুউক ওদের গভীর স্নেহ- আদরে লালন- পালন করে। মানুষের
জীবনের গতি তো এমন সূত্র ধরেই চলে। ছেড়া ছেড়া আখ্যান গুলোকে সযন্তে একত্রে পুঞ্জিভূত করে। বেঁচে থাকতে হলে মনোরঞ্জন অবশ্যই
প্রয়োজন। কিন্তু মায়ার জালে পরে মনোরঞ্জন করতে গিয়ে শেষে যদি হিতে বিপরীতহয়? আবার
অবান্তর ভাবনা! মনোরঞ্জনে আর দোষ কি? নিজে ভাল হলেই জগৎ ভাল। সত্য- সুন্দরের পথে
থেকে সৎ জীবন যাপন করলেই জীবন ধন্য।
অনেক্ষণ বারান্দায় বসে থাকলো ডিউক। তারপর উঠে গিয়ে চৌকিতে হেনেরার পাশে এসে বসলো।
হেনেরা আধ-ঘুম অবস্থায় ছিলো। ডিউকের উপস্থিতিতে তার তন্দ্রা ভাঙ্গলো। চোখ না খুলেই
জিজ্ঞাসা করলো – এখন কেমন লাগছে?
কিছুটা ভাল-
খাবে কিছু-
হু-
ঠিক আছে। তুমি বসো,
তোমার জন্য নুডুলস্ করে দিচ্ছি। বলেই হেনেরা গা তুললো। কিছুক্ষণ পর নুডুলস্ এনে ডিউককে দিলো, নিজেও নিলো। আজকে
নুডুলস্ একটু বেশি টেস্ট হয়েছে। তাইনা হেনেরা? হেনেরা বললো, কি জানি, আমিতো
সবকিছু নিয়ে তোমার মতো অতো গবেষণা করি না। খেতে হয় তাই খাই। তোমার হেয়ালীপনা গেলো
না, খেতে খেতে বললো ডিউক। তারপর দুজনই চুপচাপ খাওয়া সেরে উঠলো।
মেয়েটা স্কুলে গেছে কিছুক্ষণ আগে।
ছেলেটা বিছায় ঘুমিয়ে আছে। ডিউক বিছানায় গা
এলিয়ে দিলো । পাশে হেনেরা বসা। ডিউক চোখ বন্ধ করে
ভাবে সংসারের বেহাল দশা, কিভাবে আয়- রোজগার বাড়ানো যায় সেসব
কথা। ওদিকে শরীরটাও দিন দিন খারাপের পথে; এমনও দিন যায় অর্থাভাবে মেয়েকে টিফিন
পর্যন্ত দেওয়া হয়না। কম দামে কিছু আটা কেনা ছিলো তা থেকে বাসায়ই নুডুলস্ বানানো
হয়েছিলো বলে কয়েকদিন হলো চলে যাচ্ছে। তছাড়া চারটি প্রানির ভরণ – পোষণ এই বাজারে চারটি
খানে কথা নয়। নতুন কোন ভাবনা তাকে ভাবতেই হবে। আবার সেই ছোট বেলার দিনগুলোর কথা
মনে পড়ে যায় ডিউকের। কেমন সুন্দর-ই ছিলো দিন গুলো? না ছিলো উপার্জনে চিন্তা, না
ছিলো কোন দায়-দায়িত্ব, না ছিলো কোন পিছু টান! শুধুই হৈ হুল্লর, খেলাধুলা আর
আড্ডায় কেটে যেতো দিন গুলো। মাঝেমাঝে
জ্ঞানী- গুনীদের সান্নিধ্য যে লাভ হয় নি তা কিন্তু নয়। তারা একেক জন ছিলো ভিন্ন
ভিন্ন পথের যাত্রী। কিন্তু সে দিন না বুঝলেও আজ ডিউক ঠিকই বোঝে তারা সবাই মেকী
নৈতিকতার মোড়কের আড়ালে বেছে নিয়েছিলো অবাঞ্চিত পথ। হয়তো তারা না জেনে ওগুলো করতো
অথবা জেনে। তবু কেন মানুষ নিজের দলকে অন্ধের মতো ভারি করার চেষ্টা করে? হঠাৎ করে
লেজ কাটা শৃগালের গল্পটা মনে পড়ে যাওয়ায় ডিউক মনে মনে একটু হাসলো। যাক ওসব কথা।
ক্ষমতা নয়, সত্য- ন্যায়ের পথই চির শ্বাশত, চির সুন্দর। তবু কেন মানুষ শুধু শুধু
এগুলোর পিছু ছোটে! প্রেম-প্রীত , ভালবাসা, স্নেহ- মমতার মতো র্স্পশকাতর ব্যাপার
গুলোও কি কখনো জীবিকা করা যায়? করতে পারলে হয়তো-বা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতো
এটা। কিন্তু তাতে তার জীবনে কি স্বস্তি থাকতো আদৌ? আজ হয়তো অসুস্থ শরীরে ডিউকের
চিন্তাগুলোও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। সে হয়তো বেশি দিন বাঁচবে না, এমন চিন্তাও তার
মাথায় ঘুরপাক করে ইদানিং। আচ্ছা, সত্যিই এখন যদি সে মরে যায় তাহলে তার মরদেহটা কি
করবে? হ্যাঁ, মরদেহটা সে কোন এক মেডিকেল
কলেজ দান করে যাবে। যাতে করে শুধু শুধু পঁচে গলে মাটিতে মিশে যাওয়ার চেয়ে কোন একটা
কল্যাণ্মুখী কাজে লাগতে পারে। যাতে করে কেউ ভুয়া সার্টিফিকেট অর্জন করে ভুল
চিকিৎসা না দেয়।
অসুস্থ শরীরে এমন সব
উদ্ভট চিন্তা করতে করতে এক সময় গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় সে। ঠিক এমন সময় চোখ জুড়ে
স্বপ্নরা এসে দানা বাঁধে। গহীন অরণ্য। ডিউক একা একা হাঁটছে। হঠাৎ চোখে পড়লো সামান্য
একটু ফাঁকা জায়গায় একদল শকুন একটা হাতিকে ঘিরে হুরোহুরি করছে। সে একটু এগিয়ে যায়।
প্রাণীটার বুকের নিচে একটা ক্ষত আর ঐ ক্ষত স্থানে শকুনগুলো তীক্ষ্ণ ঠোঁট দিয়ে
লাগাতার ঠোকরাচ্ছে, খুবলে খুবলে মাংস ছিড়ে ছিড়ে খাচ্ছে। কিন্তু কি আশ্চর্য!
প্রাণীটা তখন পর্যন্ত জ্যান্ত। যন্ত্রনায় ছটফট করছে। চাপা অস্ফুটো গোঙ্গানী বের
হচ্ছে গলা দিয়ে। ঐ ক্ষত স্থান থেকে ঝর্ণাধারার মতো বয়ে চলেছে রক্তের ধারা। পাশে
ঘুমানো ছেলেটা কান্না শুরু করায় ডিউকের ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে অবধি হেনেরা ডিউকের পাশেই বসে ছিলো।
তড়িঘড়ি করে ছেলেকে কোলে নিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে। দুপুর আসন্ন প্রায়। ডিউক
বিছানা ছাড়লো।


No comments
Thanks for message